Thursday, March 20, 2025

#রং #পর্বঃ৪২

 



থাইল্যান্ডের স্বপ্নের পর্যটন শহরের নাম ফুকেট। এক অলস দিন নির্জন ঝুরঝুরে বালুর সৈকত চোখের পলকে নিমিষেই শেষ হয়ে আফসোস নিয়ে উঠে আসার মতো জায়গা হলো ফুকেটের পাতং। রাতের আধারে নির্ভেজাল, সহজ পানি পথে অবৈধ মালামাল পাচার সহ অবৈধ চলাচল সহজ পন্থা অবলম্বনে,যুগ যুগ আগেই ভৌগোলিক দূরত্ব থেকেই এর সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা করে রেখেছেন কালো জগতের অধিপতি, এখন বাংলাদেশ থেকে ফুকেট মালামাল সহ আস্ত মানুষ পাচার করাও যেনো চোখের পলকের ব্যাপার। দূর থেকে কলকাঠি নেড়ে খুব সহজেই নিজেকে কালো অধ্যায় থেকে আড়াল করে রেখেছেন কেউ একজন।তাই খুব সহজেই এসপির সহকারী সহ এসপিকে জাহাজ থেকে চোখ বেঁধে চার দিন আগেই নিয়ে আসা হয়েছে পাতং রিসোর্টে।তারা এখনো দ্বিতীয় তলার একটি কামরায় বন্দী অবস্থায়। তাদের ধারালো মস্তিষ্ক কিছুক্ষণের জন্য স্থির রাখতে দুটো রাতেই ব্যবহার হয়েছে ক্লোরোফর্ম। ঘুমের ঘোরে কেটেছে আস্ত একটা দিন।এখন ধারালো মস্তিষ্কধারী এসপি নিস্তব্ধ, নিরব।
আধার কে দূরে ঠেলে দিয়েছে রঙবেরঙের স্বর্ণালী আলোকদ্যুতি, আলোয় রাঙা রাতে মাথা চারা দিয়ে উঠেছে ফুকেট নতুন রূপে।নিজের কেবিনরুম থেকে বের হয় রাফসান, বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো চেপে রাখা মাথা ক্রমেই অশান্ত হচ্ছে তার,হাতের পেশী ফুলে উঠছে মনের ক্ষোভে।এসপি"র আধার রুমের দরজা ধাক্কা মেরে খোলে রাফসান। অফহোয়াইট রঙের চার দেয়াল। পেছনের জানালার কাচ মেঝে ছোঁয়া, অদূর থেকে ক্ষণে ক্ষণে ধেয়ে আসা নীল রঙের সৈকতের পানির অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করার উপায়খানি চাপা দেয়া আছে আধুনিক সাজসজ্জার ভারি পর্দায়। এই মূহুর্তে দেয়ালে পাশাপাশি বাঁধা অবস্থায় আছে ইরফাদ, বাকি একজন একটু দূরেই। দীর্ঘ সময়েয়ের জমে থাকা তিক্ততা, ক্ষোভে যেনো পুড়ে পুড়ে জ্বলে উঠছে রাফসান,তার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে মুখের চোয়ালে,হাতের পেশীতে। প্রতি মূহুর্তে হিসহিসিয়ে উঠছে সে। শক্ত পেশীবহুল হাতে একটানে সামনের দেয়াল থেকে টেনে নেয় পর্দা,দেয়ালের বুকে ডুবে থাকা বিশাল টিভি রিমোট চেপে অন করে রাফসান। অন্ধকার রুমে টিভির কালো পর্দা ক্রমেই হয় রঙিন,সে আলোকদ্যুতি চোখে মুখে পরে ইরফাদের। পটলচেরা বড় বড় চোখ দুটি মেলে তাকায় ইরফাদ। তাকায় জাবিরও। টিভির পর্দায় গোলাকৃতি মাঠ, তা সবুজাভ ঘাসে আচ্ছাদিত, বিশাল অডিটোরিয়াম, ঝাকে ঝাকে সাজানো চেয়ারে চাতক পাখির মতো বসা দর্শক। হাতে স্বদেশের পতাকা, আবার কারো কারো গালে আঁকা। মাঠে নেমেছে দুই প্রতিপক্ষ দল, দাঁড়িয়ে আছে খেলার পূর্বপ্রস্তুতি নিতে। ইরফাদ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে টিভির পর্দায়। দু"মিনিটের মধ্যে শুরু হয় ক্রিকেট খেলা। যে খেলা গুলো হয়ে গেছে পূর্বেই।রাফসান নিজের মধ্যেই ফুলে ফেঁপে উঠছে বিধ্বংসী রূপে, ভেতর থেকে নৃশংস, হিংস্র রূপ ক্রমেই ফুটে উঠছে তার প্রতিচ্ছবিতে। গলায় ঝংকার তুলে বলে,
-- দেখ.....। নিজের দেশের নাম,যশ, খ্যাতি কি করে বিক্রি হয় নিজের চোখে দেখ। শুধু দেখবি আর পুড়বি..... হাতে কিচ্ছু নেই তোর। কিচ্ছু না।
ইরফাদ কিছুক্ষণ পজ দেয়। তারপর তেরছা গলায় বলে,
--তাতে তোর কি লাভ?
রাফসান পায়চারীর তালে পৈশাচিক গলায় বলে,
-- শত্রুকে চোখের সামনে হারতে দেখার মতো সুখকর জিনিস পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এই সেই খেলা-- যে খেলায় হেরে গেছে, থেমে গেছে আমার জীবন। শুধু তোর জন্য।
রাফসানের বাজখাই গলায় ওঠা প্রতিটি শব্দের তোড় যেনো দেয়ালে দেয়ালে বাড়ি খায়,প্রতিটি শব্দে ক্রোধের পাহাড় হিসিয়ে হিসিয়ে ওঠে। বাজখাই গলায় ঝড়ে যেনো ধ্বংসলীলা,
-- তোর জন্য সব হারিয়েছি।ধ্বংস করেছিস সব তুই। তাই তোর ধ্বংস দেখার নেশায় ঘুম হয়না আমার।
-- যুগে যুগে যতোবার সম্রাট শাহজাহান জন্মাবে তার সামনে বেরিকেড হয়ে দাড়াবে কর্ণেল রিদুয়ানুর রহমান আর শয়তানদের পদচিহ্ন মুছতে হাজার বার হাজার বীরের মধ্যে জন্মাবে এই ইরফাদ....পারলে তুই ঠেকাস!
হাতে বয়ে আনা রেড ওয়াইনের বোতল টেবিলে রাখে রাফসান। একটা স্বচ্ছ কাচের ইউ আকৃতির গ্লাসে আয়েশী ভঙ্গিতে ঢালে লাল রঙের তরল। তারপর একটা ইজি চেয়ার চেনে মুখোমুখি আয়েশী ভঙ্গিতে বসে রাফসান। ইরফাদের পিছনে বাঁধা হাত। চেয়ারের হাতলে পা উঠিয়ে ওয়াইনের গ্লাসে ঠোঁট ডুবিয়ে শক্ত ঢোক গেলে রাফসান। সহসা শরীর হেলিয়ে দোল খায়। ইরফাদের কথা গুলো মস্তিষ্কে গেঁথে নিয়ে দূনির্বার ভঙ্গিতে শক্ত পায়ে চেয়ারে সজোরে লাথি মারে রাফসান। পেছন দিকে হেলে যায় চেয়ার। জাবির হুংকার ছাড়ে। ইরফাদ চোখের ইশারায় বলে,"শশশ"! রাফসান হো হো শব্দ ভাসিয়ে তালে তালে বলে,
-- তোকে হারতে দেখার ভিষণ শখ! তুই দেখবি পরিবার থাকতে না ছুঁয়ে দেখার যন্ত্রণা, ক্যারিয়ার ধ্বংস আর দেখবি চোখের সামনে কিচ্ছুটি করতে না পারার ছটফটানি, ভেতরের জ্বালা আর আর্তনাদ। আমি তা নিজ চোখে দেখে তৃষ্ণা মেটাবো.....
একদমে বলে গ্লাসের তলায় থাকা র*ক্ত*লাল তরলটুকু এক দমে গিলে চোখ মুখ খিচে ফেলে রাফসান। সেই রুমের বাইরে মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা রাফি পুরো দৃশ্য না দেখেই অনুভবের জগত সাজিয়ে এক পৈশাচিক হাসিতে ভেতরে ভেতরে ফেটে পড়ে আর মনে মনে বুলি আওড়ায় সব এতো সাজানো গোছানো হলে চলে?? তার কোনো কষ্ট ই করতে হচ্ছে না। তবে এতো দিন উঠতে বসতে "বস" "বস" সম্মোধন করতে ভিষণ কষ্ট হয়েছে তার। এখন থেকে সে নিজেই বস। নিজের শার্টের কলার ঝাকিয়ে বুক ফুলিয়ে বলে ওঠে--" রাফি ইজ দ্যা বস অফ ডার্ক ওয়ার্ল্ড।"
সহসাই পকেটের ফোনটা কানে তুলে নেয় রাফি। গলার স্বরে অপ্রত্যাশিত মূল্যাবান জিনিসটি হারিয়ে ফেলেও আবার অনায়েসেই পেয়ে যাওয়ার উচ্ছাস। টাকার কাছে মানুষ কতো দূর্বল, ভালোবাসা সেদিন বিক্রি করেছিলো টাকার অংকে।সেদিন সহজ সরল সিনথিয়াকে সহজেই বিছানায় টানা যেতো, শুধু টাকার বেড়াজালে জীবন থেমে গিয়ে সিনথিয়াকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো। মোটা অংকের ঋণ আর দুশ্চিন্তা সেদিন তার শক্তি শুষে নিয়েছিলো। ভালোবাসার মানুষটিকে জোর করে বিয়ে করার উপায় থাকলেও মাথায় ছিলো পাহাড়সম ঋণের বোঝা। তাই একটু দূরে দিতে গিয়ে হারিয়েই ফেলেছিলো। রাফির মাথায় যদি কোনো নারীর সৌন্দর্য একবার ঢুকে যায় তাকে পেতে পাতাল থেকে অন্য গ্রহেও যেতে রাজি। অন্য কোনো সুন্দরী রমণী হলে টেনে হিচড়ে না হয় বিছানায় নিতো। তবে কিছু সুখ চিরস্থায়ী করতে তাকে সারাজীবন পাশে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে। এই জন্যেই না এতো কষ্ট। সিনথিয়াকে তো সে চায় বউ রূপে। সারাজীবনের বউ। সুন্দরী সব রমণী তার বিছানায় হাজারটা আসতে পারে। বউ এর স্বীকৃতে নাম থাকবে শুধুই সিনথিয়ার। "মিসেস রাফি চৌধুরী। বলেই পৈশাচিক হাসি দেয় রাফি। ফোন কল পেয়ে দুজন গার্ড চলে আসে। ধবধবে সাদা চামড়ার বিশাল দেহীর দু"জন বলিষ্ট পুরুষ।গায়ে জড়ানো কালো রঙের শার্ট, প্যান্ট। পায়ের বুট হাঁটু অবধি ঠেকেছে। হাতে রাইফেলের ট্রিগারে আঙুল, নল নিম্নমুখী। দু"জন ফরেনার সিকিউরিটি"র জন্য নিয়োজিত। দরজার বাইরে লক দিয়ে মুখে হাসি এঁকে বেরিয়ে যায় রাফি। পুরো দ্বিতীয় তলা জুড়ে সিকিউরিটি। একরুমে তিনজন ক্লোরোফর্মের ঘ্রাণে যখন জ্ঞানহীন, ছাদে একটুকরো চাঁদ, আকাশ বাতাস সাক্ষী রেখে চলবে বিয়ের আয়োজন। মনের অন্তরালের দৃশ্যপট চোখে ভাসতেই ওষ্ঠাধর প্রশস্ত করে রাফি।
__________________________________
প্রদীপ্ত নিয়নের আলো উজ্জলয়মান সুউচ্চ রিসোর্টের সুবিশাল ছাদ, বিন্দু বিন্দু তারায় অংকিত উদাম উন্মুক্ত আকাশের বুক তার এককোণে আলোয় হাসছে উদীপ্তমান রূপালী চাঁদ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আয়োজিত ব্যবস্থাপণা সুনিপুণ। বর বউ মুখোমুখি বসার জন্য পাতা হয়েছে দুটো রাজকীয় ডিভান,দুটো ডিভানের মাঝখানে কুচিকুচি করে টানা হয়েছে ফিনফিনে পাতলা পর্দা । আর্টিফিশিয়াল সাদা সাদা বেলীর কলি পর্দার উপর নিচ হয়ে ঝুলছে আবার মৃদু বাতাসে ক্ষণে ক্ষণে দুলছে,কখনো উড়ছে। ছাদের একপাশ জুরে সিকিউরিটি ব্যবস্থা,যাদের পরণে কালো রঙের পোশাক, পায়ে বুট, হাতে রাখা রাইফেলের নল নিম্নমুখী। তাদের তীক্ষ্ম চোখ আর ট্রিগারে রাখা হাতের তর্জনী যেনো প্রতিঘাতের জন্য সবর্দা সচল, বিয়েতে বাঁধা দিলেই ঝাঝড়া হয়ে যাবে প্রতিপক্ষের বুক। অফহোয়াইট কালারের শেরওয়ানি পড়ে ডিভানে হাতের উপর ভর করে রাজকীয় স্টাইলে শুয়ে আছে রাফি। ব্লুটুথের ক্ষীণ গানের তালে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে আর মধুচন্দ্রিমার কল্পনায় ভাসছে সে।
ফিনফিনে পর্দার ওপারেও আছে একই সিকিউরিটি ব্যবস্থা শুধু তারা ফিমেইল ভার্সন। তাদের আধখোলা লম্বা পায়ে পড়া কালো কুচকুচে থাই বুট, স্কিন টাইট লেদারের মিনি স্কার্ট,মাথার মধ্যে অসংখ্য বিনুনি,আধখোলা পোশাকে হাতে রিভলবার নিয়ে রোবটিক্স স্টাইলে দাঁড়িয়ে তারা। যেনো হুকুমের গোলাম, সংকেত পাওয়া মাত্র ঝাপিয়ে পড়বে প্রতিপক্ষের উপর। "আরেকটা দায়িত্ব তাদের, সিনথিয়াকে চোখে চোখে রাখা, যা ঝাঝালো মেয়ে কখন কি করে বসে।" তবে আজ কোনোই লাভ নেই যা বলবে রাফি,আজ তাই হবে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে সিনথিয়ার আগমন ঘটবে। ভাবতেই উচ্ছাসে হেসে ওঠে রাফি। সহসাই দরজায় দেখা যায় কালো অর্ধখোলা পোষাকে দুজন নারী। ওদের উপর অর্পিত ছিলো সিনথিয়াকে বউ সাজানোর দায়িত্ব।"তাহলে সিনথিয়া এসে গেছে?" সিঁড়ি ভেঙ্গে ক্রমেই উদয়মান হচ্ছে সিনথিয়ার ঘন চুলভর্তি মাথা,কপাল এরপর ডাগর ডাগর চোখ যেনো পূর্ব আকাশে রক্তিম স্বর্ণালী সূর্য ধীরে ধীরে উদয়মান হচ্ছে ধরীত্রির বুকে।সর্বোচ্চ ধীর গতিতে চোখের সামনে উদ্ভাসিত হচ্ছে সিনথিয়ার নতুন রুপ,রুপের ঝলকে রাফির হৃদয়ে মাদকীয় উন্মাদনা খেলা করে যাচ্ছে। যেনো এক গোটানো পদ্মের কলি চোখের সামনে সময় নিয়ে খেলা করে, ধীরে ধীরে কোমল পাপড়ি ছড়াচ্ছে। অবশেষে সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাদে পা রাখে সিনথিয়া,পাতলা কোমল শরীর ঘিরে আছে অফহোয়াইট কালারের ভারী লেহেঙ্গা, যার নিচের অংশবিশেষ এখনো ছেঁয়ে আছে সিঁড়ি, লেগেঙ্গা"র অংশবিশেষ দুহাতে টেনে খামছে উঁচু করে ধরে আছে সিনথিয়া। লেহেঙ্গা"র উপরের অংশের কাপড়টুকু গলা আর কাঁধ ছেড়ে হেলে পড়েছে দু'ডানার উপর। উন্মুক্ত গলায় ভাঁজ, উন্মুক্ত হৃদপিণ্ডের উপরিভাগ চোখে আটকে গেঁছে ক্যাপচারের মতো,অজান্তেই মাদকীয় উন্মাদনায় নেশাক্ত চোখে কয়েকবার শক্ত ঢোক গেলে রাফি, রাজকীয় ভঙ্গিতে ডিভানে আধশোয়া থেকে উঠে বসে আর ওয়াইনের স্বচ্ছ গ্লাসে লোভনীয় চুমুক দেয়। যেনো ওয়াইনের গ্লাসে র*ক্তলাল তরল নয়, আলোয় উদ্ভাসিত সিনথিয়া জীবন্ত চাঁদ এই মাত্র আকাশ থেকে তার সামনে নেমে এসেছে, তার শরীর থেকে আলোকদ্যুতির মতো চুঁইয়ে পড়া জ্যোস্নার আলো ওয়াইনে মিশিয়ে লোভাতুর ভঙ্গিতে গিলে খাচ্ছে রাফি। সিনথিয়ার পেছনে আধখোলা পোশাকে দাঁড়ানো মেয়ে সিনথিয়ার কানে কানে বলে,"ইউর উড বি " সিনথিয়া কানের ফিশফিশানো শব্দে রাফির পানে তাকিয়ে টিপটিপ হাসে। সহসাই এক শক্তিশালী বিদ্যুৎ খেলে যায় রাফির সমস্ত শরীরে, হাত থেকে ছিটকে পড়ে ওয়ানের গ্লাস, চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে শক্ত পাটাতনে। রাফি সিনথিয়ার পেছনের যন্ত্রমানবীর মতো মেয়েগুলোকে নির্দেশ দেয়,
-- তোমরা দেখতে পারছো না। আমার পাখির হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। বসাও..... বসাও......
সিনথিয়া কাঠের পুতুলের মতো কথা শুনছে, মেয়ে গুলো একটু হেলে সিনথিয়ার ভারী লেহেঙ্গা দু"পাশ ধরে, সিনথিয়া পুতুলের মতো ঠোঁট ছড়ায়, সামনের ডিভানের দিকে ছোট্ট ছোট্ট করে পা ফেলে। ক্রিস্টাল পাথর বসানো ভারী লেহেঙ্গা মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সব যেনো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। উপর থেকে ভারী পাথরে সাজানো টার্সেল কোমর ছুঁয়ে ঝুলছে, দুলছে।উপরের ব্লাউজ শেষ হয়েছে কোমরের উপরে,আর উন্মুক্ত শ্যামলা পাতলা পিঠের দুদিক থেকে সরু ফিতের বাঁধন সামনের একটুকরো কাপড়কে আগলে রেখেছে। রাফি ঘোর লাগা দৃষ্টিতে স্বপ্নের রাজ্যে চলে যাচ্ছে বারংবার। সিনথিয়া রাজকীয় ভঙ্গিতে রাজকন্যা বেশে পায়ের উপর পা তুলে শীরদাড়া টান টান করে বসে। ভারী লেহেঙ্গা ফোটা সাদা শাপলার মতো ছড়িয়ে পড়ে। আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানবী পাতলা ফিনফিনে ওড়না'র দুপ্রান্ত উড়িয়ে এনে ঠেকায় সিনথিয়ার খোপায়। রাফির ঠোঁট জুরে দুষ্টু হাসি। মনে মনে নিজেকে সুধায়...." স্বজ্ঞানে থাকলে সিনথিয়া এই বেশে কখনো আসতো তার সামনে? তার স্বপ্ন ছিলো-- হাজার নারী তার বিছানায় গড়াগড়ি খেলে বউ হবে একজন-ই। এমন রাজকীয় পোশাকেই হবে বিয়ে। যেখানে বিয়ে হওয়া টাই অসম্ভব, সেখানে আধখোলা পোশাক তো বিলাসিতাই। দুবছর আগে যদি এই মেয়ের ন্যাকামি সহ্য না করতো, কবেই বিছানায় ছিটকে ফেলতো রাফি। তবে সিনথিয়াকে আর পাঁচটা নারীর মতো লাগেনি।মন বলতো সবাই বিছানায় ঠাঁই পায় কিন্তু মনে জায়গা হয় একজনের-ই। সিনথিয়া বউ ম্যাটারিয়াল। তাইতো ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে পথ জটিল করেছিলো রাফি। তবে পথ যত জটিল অর্জিত মূল্যাবান জিনিস ভোগ ততো তৃপ্তির। স্বপ্ন যে সত্যির পথ ধরেছে।" ভাবতেই ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি ফুটে রাফির।
গতকাল ফুকেটে ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে আসা এক ধর্মভীরু হুজুরকে রিসোর্ট থেকে তুলে এনেছে রাফি। তার মাধ্যমেই পড়ানো হবে বিয়ে। তিনি আছেন ছাদেই হাত,চোখ মুখ বাঁধা অবস্থায়। রাফি উচ্ছসিত গলায় বলে," হুজুর সাহেব বিয়ে পড়ান।"
সিনথিয়ার পেছন থেকে একজন যন্ত্রমানবীর মতো ইংলিশে বলে ওঠে," সামনে দেখছেন ঐ আপনার পছন্দের পুরুষ। আপনার সাথে বিয়ে হচ্ছে। আপনি বলবেন," আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল।"ওকে?
সিনথিয়া ঠোঁটে হাসির ঝিলিক।সে মাথা দুলিয়ে বলে,"ঠিক আছে।"
___________
রাফসান কথা বলতে নেশার ঘোরে ঘুমিয়ে গেছে অনেকটা সময় ধরে। ইরফাদ এর ফাঁকে কিছু কাজ করে নিয়েছে।এখন দরকার দরজার বাইরে যাওয়া। আগে থেকেই থাকা চাবি দিয়ে দরজার নবে ইন করায় ইরফাদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত নব ঘুরলেও দরজা খোলে না। ইরফাদ চিন্তিত চোখে জাবিরের দিকে তাকায়।সেই মূহুর্ত্তেই ঘুম ভেঙ্গে চট করে চোখ খোলে রাফসান। বেঁধে রাখা দুজনকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্মিত হয় রাফসান। ঢুলু ঢুলু শরীরে জোরপূর্বক তেজ দেখিয়ে উঠে দাঁড়ায় রাফসান।দুপক্ষের লেগে যায় যুদ্ধ। ঢুলতে থাকা শরীর নিয়ে তেড়ে যায় ইরফাদের দিকে। পায়ের বুটে সাথে গেথে রাখা রিভলবার তাক করে ইরফাদের দিকে। দু"হাত উপরে তোলে জাবির, ইরফাদ। রাফসান নিজের কোমরের ওয়ারলেস ডিভাইসে সিগন্যাল দেয় । কিন্তু সময় গড়ালেও কারো উপস্থিতির নাম গন্ধও নেই। ইরফাদ নিজের দু"হাত উপরে তোলে। বলিষ্ট শক্তিশালী অভিজ্ঞ পা শূন্য তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা রিভলবার থাকা হাতে শক্ত ভারী আঘাত করে ইরফাদ। রিভলবার ছিটকে পড়ে দূরে। সহসাই জাবির তুলে নেয় রিভলবার। তারপর ঘুরে উঠেই জাবির রাফসানের মাথার খুলির পেছনে রিভলবার ঠেকায়। আর তেরছা হেসে বলে,
--অনেক খেলেছো। এইবার একটু আমরা খেলি....দরজা খোল.
রাফসান পাথুরে মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। জাবির রিভলবার মাথায় ঠেলে তাড়া দেয়। রাফসান বাধ্যমতো চাবি বের করে নব ঘুড়ালে চোখ কুচকে ফেলে। দরজা বন্ধ। বেশিরভাগ সময় নব এই লক দেয়া হয়। কিন্তু এখন বাইরে থেকে দরজা লাগানো। রাফসান ফোন বের করে রাফির নম্বরে কল দেয়। " বন্ধ বন্ধ" বার বার একই কথা শুনতে শুনতে হিসহিসিয়ে ওঠে রাফসান। মস্তিষ্কের সিগন্যালের প্রেরিত বার্তায় লেখা আশঙ্কা শব্দটিকে কেন্দ্র করে পুরো বিষয় তলিয়ে ভাবে রাফসান। পেছন থেকে জাবির তাড়া দিয়ে বলে," চালাকি করে লাভ নেই।" তবে সে দিকে কোনো তাল-ই নেই তার। শামুকের শক্ত খোলসের আড়ালে নরম মন যে তাকে তেড়ে বেড়াচ্ছে "ছোটপাখি" নামক দূর্বল জায়গাটার বিপদের শঙ্কায়। আর বিবেক নামক অদৃশ্য সত্তা তাকে ধেয়ে আসছে," কেনো নিজের বোনকে এসবে জড়ালো সে? কেনো বিপদের মধ্যে ফেলে দিলো।" টাকা এমন এক ক্ষমতা নিমিষেই শক্তি রূপান্তরিত করতে পারে। এই মূহুর্ত্তে তার কথা কেউ শুনছে না। কেউ না।দরজার হাতলে শক্তি দিয়ে মোচড়াতে থাকে। অশনী সংকেত তার মাথায় তীব্র গতিতে আঘাত হানে।সহসাই মন ঝড়ের মতো লন্ডভন্ড হতে যায়। হাসফাঁস করা গলায় বেজে ওঠে চিন্তার মৃদু সুর। সে সুরে ফুটে ওঠে কোমল একটা শব্দ "আমার ছোট পাখি।" রাফসানের তেজস্বী গলার ভাঙনে ইরফাদ তলিয়ে ভাবে বিষয়টা "ছোটপাখি" কে? নাকি নতুন ফাঁদ। সহসাই পিছু ঘুরে রাফসান। রগচোটা, শক্তিশালী, বিধ্বংসী গলা ভেঙ্গেচুরে একাকার। সে গলায় ফুটছে অসহায়ত্ত্বের করুণ সুর," ডোর অফ,রাফি সিনথিয়াকে বিয়ে করার জন্য প্রচুর ঝামেলা করছিলো। দরজা বন্ধ বাইরে থেকে। আমার মনে হচ্ছে, ওয়াইনে কিছু মেশানো ছিলো।আমার ওয়্যারলেস ডিভাইস কাজ করছে না। রাফির ফোন বন্ধ।আমার মনে হচ্ছে সিনথিয়াকে রাফি কোথাও নিয়ে গেছে।"
_______________
রাজকীয় ডিভানে শিরদাড়া টান করে বসা রাজকন্যার চোখ দুটো ছেপে আসছে শীতের সকালের কুয়াশার মতো। চোখের সামনে সব আবছা লাগছে। পেছনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গেলেই মস্তিষ্কে চাপ পড়ছে। টনটন করছে মাথা। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না সব ভ্রম নাকি বাস্তব। হাত দুটো কাঁপছে কনকনে শীতের বরফ শিক্ত আবহে। ঠান্ডা শীতল পায়ের পাতা। যেনো শক্তিশূন্য অসাড় শরীর। পর্দার আড়ালের রাজকীয় ভাবে বসে আছে কেউ। তার মুখ অস্পষ্ট। অদূর থেকে ভেসে আসা কন্ঠস্বর বলছে,--"বলুন কবুল।" পেছন থেকে রোবটিক্স স্টাইলে দাঁড়ানো মানবী তার সামনে ধরে আছে একঝুড়ি ফুল। সে যন্ত্রমানবীর কন্ঠে ভেসে আসছে," টেক ব্রেথ এন্ড সে "কাবুল"।
সিনথিয়া চোখে দোদুল্যমান দৃশ্যপট তাকে ঘোরের মধ্যে চুম্বকীয় আকর্ষনে টানছে। মাথা থেকে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে বলে দে "কবুল।"। তবে ঘন্টাখানেক আগের দৃশ্যপট আবছা হয়ে চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ঘন্টাখানিক আগে সিনথিয়া বিছানায় বসে ছিলো। দুজন মেয়ে খাবার দিতে যায়। খাবার খেতে না চাইলে তারা জোর করে। তাদের সাথে একদফা যুদ্ধ চলে। অভিজ্ঞ মানবীদের কাছে হেরে যায় সিনথিয়া। জোর করে গেলানো হয় তাকে ওয়াইন। সেই থেকে ঘুরছিলো মাথা। এরপরে সাদা গুরো বালির মতো কিছু তার কাছে ধরে রাখে। অনিচ্ছা সত্বেও টানতে হয় শ্বাস এর পর..... এরপর তার আর কিচ্ছু মনে নেই।
চোখে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ভাসমান দৃশ্য স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যেবর্তীতে বিরাজমান। সিনথিয়া নিজের শরীরের পানে চায়। নিয়নের প্রজ্জলয়মান আলোয় নিজের শরীরের উপরিভাগ উন্মুক্ত, এরপর থেকেই ক্রিস্টাল পাথরখচিত ব্লাউজ শেষ হয়েছে উদরের বিবরবিন্দুর উপরিভাগেই। নিজের ঘোর লাগা দৃষ্টিতে নিজের বেহাল অবস্থা দেখে সামনে তাকায় সিনথিয়া। সামনে পর্দা টানা। সহসাই কেউ একটানে খুলে সরিয়ে দেয় পর্দা। ওপারের পুরুষ অবয়ব টের পেয়ে নিজের পোশাকের দিকে একপলক তাকিয়ে কেঁপে ওঠে সিনথিয়া। জীবনের প্রথম থেকে আজ অবধি কখনো এধরণের পোশাক পড়েনি সে। সকল প্রকার অশুভ দৃষ্টি থেকে নিজেকে সর্বদা আড়াল করে রেখেছে। শরীরে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টায় ব্যর্থ। কিশোরী বয়সের অশুভ শক্তির কাছে অসহায় ছিলো একদিন,সেখান থেকে নিজেকে তৈরী করেছিলো শক্তিশালীরূপে। তবে সে শক্তি আজ অদৃশ্য শিকলে বাঁধা। হাত পা থরথর করে কাঁপছে। মাথার ফিনফিনে পাতলা জালের দোপাট্টা টেনে ধরে বুকের মধ্যেভাগে। চোখ থেকে টুপটুপ করে পড়ছে বরফশিক্ত নোনাজল। ফুলের ঝুড়ি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দুহাত আড়াআড়ি করে ধরে। অশুভ শক্তির সাথে রুখে দাঁড়ানো সিনথিয়া মেডিসিনের প্রভাবে শক্তহীন হয়ে নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে ফেলে। নিরুপায়, অসহায়ের মতো কাঁপছে সিনথিয়ার ওষ্ঠাধর। রাফি হাঁটুগেরে সামনে বসে। কোমল স্বরে বলে,
--ভয় পাচ্ছো কেনো? আমি ই তো। কবুল বলো.....জান কবুল বলো।
চোখের সামনের দৃশ্যপট মৃদুমন্দ বাতাসে যেনো দুলছে। সিনথিয়া ভারী হয়ে আসা চোখের পাতা টেনে খুলে রাখছে। সে নিজেকে রক্ষায় গুটিয়ে নিচ্ছে শক্ত খোলসের আড়ালে। রাফি আবার বলে,
--বলো।
সিনথিয়া কাঁপা গলায় বলে,
--ননাহহ..
রাফির অশুভ সত্বা যেনো বেরিয়ে আসে। শক্ত আঙুলে চেপে ধরে সিনথিয়ার চোয়াল। গোল হয়ে আসে ওষ্ঠাধর। সিনথিয়ার বুকের গহীনে চলা আগ্নেয়গিরির উত্তাপ চোখ ফেঁটে বের হয় না। শরীর অসাড় হচ্ছে ক্রমেই। রাফির ভয়ংকর রুপ বেরিয়ে আসে,
-- কবুল বল!
সিনথিয়া চুপচাপ। চোখের পাতা ঢুলুঢুলু। ফুরিয়ে আসছে হাতের জোর। তবুও শেষ চেষ্টা স্বরুপ হাত চেপে আছে নিজেকে ঢাকতে। রাফি টেনে খুলে দেয় হাত,
-- তোর আমার সামনে এতো কিসের ন্যাকামি? তোর নাটক দেখতে দেখতে চোখ ভোরে গেছে। দুই বছর ন্যাকামি সহ্য না করে প্রথমেই যদি বিছানায় নিতাম তাহলে পায়ের তলায় গড়াগড়ি খেতি নিজেই বিয়ের জন্য। রাফির বিছানায় বউ হয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর সবাই। সস্তায় পেয়ে মূল্য দিচ্ছিস না তুই। কবুল বল।
ঘৃণায় ভেতর ফেটে গা গুলিয়ে আসে, উপর থেকে মানুষ আসলে ফুটফুটে সুন্দর,ভেতরের নর্দমা যখন সামনে আসে তখন গা গুলিয়ে আসে। একেই ভালোবেসে একদিন কেঁদেছিলো। ভাবতেই শরীর এলিয়ে দেয় সিনথিয়া ডিভানে।
এতো চেষ্টায় হারিয়ে ফেলা জিনিস খুঁজে পেয়েছে রাফি। দোড়গোড়ায় পৌছে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। ডিভানে বসে শক্ত আঙুলের খামছিতে রাফি টেনে ধরে সিনথিয়ার চুল। তারপর ক্রুর হেসে বলে,
-- আঙ্গুল কি করে বাঁকাতে হয় আমি জানি। কবুল বল। না হলে তোর ভাই মুগ্ধ আমার একটা ফোনকলেই প্রাণ হারাবে।
সহসাই একদল ভয় ঝাঁক বেঁধে উড়ে এসে বুকের কাঁপন বাড়ায়। দূর্বল শরীর মন জুরে ভয়ে, দুশ্চিন্তার আবহে কাতর হয়ে যায়। চুলের মুঠিতে ঝাকুনি দেয় রাফি। গমগমে গলায় চিৎকার দিয়ে বলে," কবুল বল।"
ঠিক সে মূহুর্তে ছাদের দরজায় দায়িত্বরত দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বলিষ্ঠ, বিশালদেহী, চৌকুশ ছেলে দুটি দরজার পেছন ধাক্কায় উড়ন্ত পাখির মতো উড়ে গিয়ে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ে। ছিটকে পড়ে দরজার কব্জায় লাগানো দূর্বল স্ক্রু গুলো। শব্দ হয় টুনটুন করে।কাঠের দরজাও ধাপ করে পড়ে ছাদের মেঝেতে।ছাদের বাকিরা রাইফেল এর দীর্ঘ নল একই সাথে দরজার দিকে তাক করে ট্রিগারে আঙুল ছোঁয়ায়। রাফির দৃষ্টিও দরজার দিকে। অতঃপর নিস্তব্ধ, নিরব পরিবেশ। প্রগাঢ় নৈঃশব্দে, বিষ্ময়ে ক্ষণকালের জন্য একই সাথে থেমে গেছে ছাদে থাকা সকলের হৃদপিণ্ডের স্পন্দন। "কি হচ্ছে? প্রাকৃতিক দূর্যোগ নাকি যুদ্ধ।
সিঁড়ি ভেঙে আরেক পা উঠলো জীবন্ত, জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি যার চোখের স্ফুলিঙ্গ ধ্বংসের বার্তা প্রেরণ করছে বিক্ষিপ্ত আলোকদ্যুতি হয়ে,তার তেড়ে আসা ভঙ্গি বিদ্রোহের ঘোষনা দিচ্ছে। ধারালো মস্তিষ্কধারীর ইরফাদের আঙুল এখন রাইফেলের ট্রিগারে, নির্দয়,নির্মম আঙুলের চাপে ভারী বর্ষণের মতো নিক্ষিপ্ত বুলেটের বৃষ্টিতে ছাদ যেনো মৃত্যুপুরী।
ছাদের একপাশ যেনো রণক্ষেত্র। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলছে। জাবির লাফিয়ে তেরে যাচ্ছে প্রতিপক্ষের দিকে। মস্তিষ্কের ধারালো প্রজ্জোলনে ইরফাদ অগ্নি লার্ভার মতো উত্তপ্ত হোয়ে ধেঁয়ে আসে।তার বুলেট ঝাঝড়া করে দেয় প্রতিপক্ষের হৃদয়, বুক। যেনো ভয় নয় শুধু এগিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য। প্রতিপক্ষ রাইফেল চালানোর আগেই ঝাঝড়া, চোখের সামনে ঝড়ে পড়ে তাজা প্রাণ। রক্তের ফোয়ারায় ভাসতে থাকে ছাদ। বাকিরা অসহায়ত্ত্বের ভঙ্গিতে প্রাণ বাঁচাতে দুহাত তুলে আত্মসমর্পণ করে। সামনের ফুলে ফেপে ওঠা ঝড়, বিদ্রোহী,বলিষ্ঠ ধারালো মস্তিষ্কের অধিকারীর নির্মম হত্যাযজ্ঞে হতবুদ্ধ হয়ে বাকিরা বসে পড়ে। হাত জোর করে মিনতি করে। রাফি হতবুদ্ধ হয়ে বেতাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের রিভলবার তবে মস্তিষ্কশূন্য। দরজায় নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রাফসান।আর একটু দেরী হলেই সব শেষ হতো। ইরফাদ ঝড়ের গতিতে যেনো উড়ন্ত ঈগলের মতো রাফির দিকে যায়। ডিভানে অশ্রুসিক্ত নয়নে দূর্বলচিত্তে শরীর হেলিয়ে শুয়ে আছে সিনথিয়া। যার পরনের আধখোলা পোশাক, হাত জড়িয়ে নিজেকে ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টায় সিনথিয়া। রাগ যেনো আগুনের লার্ভার মতো টগবগ করে ফুটতে থাকে ইরফাদের। রিভলবার তাক করা রাফির হাতকে উপেক্ষা করে তীব্র গতিতে চোখে লাথি মারে ইরফাদ। রাফি ছিটকে পড়ে কয়েক হাত দূরে। কয়েক মূহুর্ত সব অন্ধকার। সব নিরব। প্রগাঢ় নৈঃশব্দে নিরব!
জাবির রাফসানের চিন্তা বাদ দেয়।রাফির পেছনে রিভলবার ধরে। এই মূহুর্তে বোনের প্রতি দূর্বল রাফসান আর কিছুই করতে পারবে না।
সমস্ত ছাদে কোমল দ্যুতি ছড়ানো আধারে ভাসমান প্রষ্ফুটিত সিনথিয়া নামক পদ্মফুলটিকে ভয়াল খেলাঘর থেকে ছোট্ট শিশুর মতো বুকের মধ্যে তুলে নেয় ইরফাদ,ভরসা নামক সস্তির চাদরে ঢেকে দেয় সমস্ত সংকোচ, সমস্ত দুঃখ। বুকের উষ্ণ উত্তাপে শুষে নেয় হীমশিতল ভয়কে। বুকের উষ্ণ আঁচে চেপে চেপে ধরে,কান্নারত মেয়েটির কেঁপে ওঠা মাথা। উদাম পিঠ ঢেকে দেয় ঘন কৃষ্ণকালো লম্বা চুলে। প্রিয় মানুষের ভরসার তুমুল আবহে উষ্ণ বুকের আলিঙ্গনে পাজর ভেঙ্গেচুরে লুকাতে চায় সিনথিয়া। ইরফাদ বলিষ্ঠ হাতের মধ্যে রেখে আরেকটু শক্ত করে ধরে কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,--"ডোন্ট প্যানিক! আমি আছি না?"
জাবির ছাদের একপাশে রাফির মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে বলে,
-- "ছেলের বাবার নাম রিদুয়ানুর রহমান, ছেলের নাম ইরফাদ সিনহা জয়, জন্মস্থান সিলেট।মেয়ের বাবার নাম সম্রাট শাহজাহান,মেয়ের নাম সিনথিয়া ইবনা।শুভ কাজে দেরি করতে নেই হুজুর সাহেব।বিয়ে পড়ান।" জাবিরের এহেম কান্ডে হতভম্ব হয়ে থেমে যায় ছাদের কিছু মানুষের হৃদপিণ্ড। রাফি, রাফসান ইরফাদ সকলেই নিজ নিজ জায়গা থেকে কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যায়। জাবির বলে মোহরানার সহ বাকি ডিটেলস আমি বলে দিচ্ছি।জাবিরের নির্দেশে চোখের বাঁধন খুলে দেয় একজন। হুজুরসাহেব খুদবা পাঠ করেন। তারপর বলেন,
-- সিলেট নিবাসী জনাব রিদুয়ানুর রহমানের ছেলে ইরফাদ সিনহা জয়, ঢাকা নিবাসী জনাব শাহজাহানের মেয়ে সিনথিয়া ইবনাকে দশ লাখ টাকা ধার্য করে পুরো টাকা বাদ রেখে,
ইরফাদ হাতের ইশারা দেয়। জাবির হাতের ইশারায় হুজুরকে থামায়। ইরফাদ নিজের তর্জনী আঙুলে পড়ে থাকা ডায়মন্ডের রিং খুলে ফেলে। সিনথিয়ার পিঠ ভাসানো চুল সামান্য সরিয়ে গলার চেইন খুলে তাতে নিজের রিং টা লকেট সরূপ পড়িয়ে দেয়। তারপর হুজুরের উদ্দেশ্য বলে, --এইবার বিয়ে পড়ান।
--সিলেট নিবাসী জনাব রিদুয়ানুর রহমানের ছেলে ইরফাদ সিনহা জয়, ঢাকা নিবাসী জনাব সম্রাট শাহজাহানের মেয়ে সিনথিয়া ইবনাকে দশ লাখ টাকা মোহরানা ধার্য করে কিছু অংশ বুঝিয়ে দিয়ে আপনাকে বিবাহ করতে এসেছে। আপনি রাজি থাকলে বলুন, কবুল।
বুকের অন্তরালে সুখকর অনুভূতিগুলো প্রগাঢ় বর্ষনে একদিকে তোলপাড় করে দিচ্ছে সিনথিয়াকে। অপরদিকে আকস্মিক এমন প্রস্তাবে বুকের কাঁপন বাড়ছে। আদুরে বেড়াল ছানান মতো বুকের উষ্ণ ওমে পেয়েও জড়সড় হচ্ছে সিনথিয়া। নতুন সম্পর্কের অদৃশ্য শেকল তাকে টানছে চুম্বকীয় আকর্ষণে। অপরদিকে পায়ের তলায় নতুন অনুভূতি নতুন পরিচয়ের টান কাঁপুনি ধরাচ্ছে। কেঁপে উঠছে ইরফাদের বুকে ঠেকানো হাত দুটোও। ইরফাদের নিগূঢ় কন্ঠস্বর কোমল হয়ে আসে। বুকের খোলসে চেপে ধরে বলে,
-- বলো! আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল।
সহসাই সিনথিয়ার কোমল হৃদয়ে এক ঝটকায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। কাঁপা হাতখানা বেগতিক ভাবে কাঁপতে থাকে। কাঁপতে থাকে পাতলা শরীরটাও।ইরফাদ আরেকটু শক্ত করে ধরে। সিনথিয়ার গলা কাঁপে। একদিকে প্রিয়জনকে নিজের করে পাওয়ার উচ্ছাস অপর দিকে অজানা ভয়ে কাঁপতে থাকে সিনথিয়া। পাজরে মাথা রেখে কাঁপতে থাকা মেয়েটিকে আরেকটু চেপে বুকির সাথে মিশিয়ে নিয়ে ইরফাদ ফিসফিসিয়ে বলে,-- বলো! কবুল...
অতপর প্রগাঢ় অন্ধকার ঢেলে আলোর দিকে পা বাড়ায় সিনথিয়া, ধেঁয়ে আসা আধারে দৌঁড়াতে দৌড়াতে মেলে আলোর দিশা। গলায় দলা পাকা ভয়কে জয় করে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
-- আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল।
এরপর,
-- আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল।
অতঃপর,
-- আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল।
শেষে,
কঠিন,লৌহশক্ত হৃদয়ের অধিকারী ইরফাদ কোমল হৃদয়ের নারীকে বুকের উষ্ণ তাপে, ভরসার চাদরে ঢেকে ভাসিয়ে নিয়ে বলে,
-- আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল!
আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল!
আলহামদুলিল্লাহ্ কবুল!
__________
দুহাটু হাঁটু ভাজ করে বসে থাকা রাফসান নিজের শরীরের শার্ট খোলে। তারপর ছুড়ে দেয় ইরফাদের হাতে। ভাইয়ের সম্বলটুকু বোনের শরীর জড়িয়ে দিয়ে সিনথিয়াকে ডিভানে বসায় ইরফাদ।দূর্বল সিনথিয়া রাখতে পারছে না নিজের শরীরের ভার। রাফসান নতজানু হয়ে বলে," ছোটপাখি আমার খুব শখের জিনিস।আমাকে মেরে ফেল। প্লিজ আমার বোনের উপর যেনো ফুলের টোকা না পড়ে। আমার পাপের শাস্তি আমার বোন যেনো না পায়।
রাজকীয় ডিভান থেকে রাজকন্যাকে দাঁড় করায় ইরফাদ। নিগূর কন্ঠস্বরে ফুটে ওঠে দায়িত্ব, ভালোবাসার এক নতুন উপাখ্যান, খোলা হয় নতুন উপন্যাসের পাতা। ইরফাদের প্রগাঢ় গম্ভীর গলায় ফুটে উঠে হীমশীতল বুলি,
-- ফুলকে কি করে বুকে আগলে রাখতে হয় তা আমি জানি।
সহসাই সস্তির শ্বাস ফেলে রাফসান। দূর্বল শরীর সিনথিয়ার, কাঁপা-কাঁপা হাতদুটোতে নিজের হাতের মধ্যে ঘষতে থাকে। তারপর সিনথিয়াকে শূন্য তুলে কাঁধের উপর নেয় ইরফাদ। দূর্বল কাঁপতে থাকা সিনথায়া উপর হয়ে ঝুলতে থাকে ইরফাদের বলিষ্ঠ কাধ থেকে নিচের দিকে, পৃথিবীর সব যেনো দুলছে। তবে ভয় হচ্ছে না। ভরসার মানুষটি ঠিক আগলে রাখবে তার দায়িত্ব নামক আলিঙ্গনে।পরম শান্তিতে বুজে আসে সিনথিয়ার ঘন আখিপল্লব। কাঁধের উপর আপাদমস্তক নারী শরীরকে ভাসিয়ে নিয়ে অশুভ উপাখ্যানের যাত্রায়,অশুভ শক্তির বিনাস করতে, তার প্রবেশদ্বার খুলতে। রাফি সহ সমস্ত শয়তানদের পেছনে বন্দুক ঠেকিয়ে হিসহিসিয়ে ইরফাদ,জাবির চলছে কালো অন্ধকার জগতে জটলা খুলতে। ইরফাদের গর্জনে উঠে আসছে,
-- ঐ ছেলেগুলো কোথায়?
রাফি দুহাত উচু করে সামনে চলছে আর বলছে,
-- আন্ডারগ্রাউন্ডে।
কালো জগতের অশুভ উপাখ্যানের প্রথম পাতা ছিড়তে ইরফাদ চলছে আন্ডারগ্রাউন্ডের দিকে।

No comments:

Post a Comment

#রং(Wrong) #পর্বঃ৬০.২

#রং (Wrong) #পর্বঃ৬০ .২ চিন্তিত সিনথিয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষে পায়চারী করছে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে, নির্ঘাত বিপদ! মোমের ঝাড়বাতিটি...